শ্মশানের ডাক – বাংলা গল্প | Horror Stories in Bengali | Bangla Bhuter Golpo

আপনি কি কখনও শ্মশানঘাটে রাত কাটিয়েছেন?
না, কোনও আত্মীয় বা বন্ধুর শেষযাত্রায় নয়…
একেবারে একা…
চারপাশে শুধু অন্ধকার, ধূপের গন্ধ, কাঠ পোড়ার ধোঁয়া… আর সেই নিস্তব্ধতা—
যা কখনও কখনও চিৎকারের থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর।

আজ আমি আপনাদের শোনাবো… আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা।
যেটা শুরু হয়েছিল এক শ্মশানের ডাক দিয়ে…
আর শেষ হয়েছিল… আমার মৃত্যুর কয়েক ইঞ্চি দূরে এসে।

অধ্যায় ১ : নতুন গ্রাম, অচেনা শ্মশান

আমার নাম ডা. অর্কদীপ মুখার্জি। বয়স তখন ২৮। সদ্য পাশ করে আমি চাকরি পেয়েছি নদিয়ার এক গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।
গ্রামের নাম—হরিপুর। ছোট্ট গ্রাম, চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত, পুকুর, তালগাছ… শান্ত, নিরিবিলি জায়গা।

কিন্তু গ্রামের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল শ্মশানঘাট।
স্থানীয়রা সেই শ্মশানকে ভয় পায়।

আমার সহকারী, কমলেশ, আমাকে প্রথম দিনেই সতর্ক করে দিয়েছিল—

—“বাবু, ওই শ্মশান এড়িয়ে চলবেন। বিশেষ করে রাত্রে। শুনেছি রাত বারোটার পর নাকি কেউ ডাক দেয়— ‘আসছিস্…?’

আমি হেসেছিলাম।
ডাক্তারি পড়াশোনায় ভরপুর যুক্তিবাদী আমি এসব কুসংস্কার মানতে চাইনি। কিন্তু আশ্চর্যভাবে সেই কথাটা কানে লেগে রইল।

অধ্যায় ২ : প্রথম রাতের অস্বস্তি

সেই রাতে আমি কোয়ার্টারে বসে রিপোর্ট লিখছিলাম। হঠাৎ চারপাশের বাতাস থেমে গেল।
নিঃশব্দ অন্ধকারে দূরে শ্মশানের দিক থেকে ভেসে এল একটা টানাটানা ডাক—

—“আসছিস্…?”

আমার বুকের ভেতর হিম হয়ে গেল।
জানালার ফাঁক দিয়ে তাকালাম—দূরে কুয়াশার মধ্যে শ্মশানঘাট স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নিজেকে বললাম—“বাতাসে শব্দ বিকৃত হয়েছে।”

কিন্তু মনের গভীরে কেমন একটা কাঁপুনি থেকে গেল।

অধ্যায় ৩ : গুজবের গল্প

পরদিন গ্রামের চা দোকানে সবাই গল্প করছিল।
এক বৃদ্ধ বললেন—

—“ওই শ্মশানটা অভিশপ্ত। দশ বছর আগে শিবু নামের এক যুবক শ্মশানে কাজ করত। এক ঝড়ের রাতে সে হঠাৎ পাগলের মতো চিৎকার করে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। কেউ তাকে বাঁচাতে পারেনি। তার পর থেকে পূর্ণিমা রাতে কেউ না কেউ ওই ডাক শুনতে পায়— ‘আসছিস্…?’

আর যে যায়, সে আর ফিরে আসে না।

আমি শুনে হেসে উড়িয়ে দিলেও মনে এক অদ্ভুত কৌতূহল জন্ম নিল।

অধ্যায় ৪ : কৌতূহলের ফাঁদ

তৃতীয় রাত।
আমি ঠিক করলাম—আজ সত্যিটা আমি নিজে প্রমাণ করব।

দূরবীন, টর্চ আর মেডিকেল কিট নিয়ে শ্মশানের দিকে রওনা দিলাম।
রাস্তার দুই পাশে শিউলি আর শিমুল গাছের ছায়া। বাতাসে অচেনা গন্ধ।

শ্মশানে পৌঁছে দেখি—বাঁধানো চিতা, কিছু অর্ধেক পুড়ে যাওয়া কাঠ, ধূপের ছাই ছড়ানো।
গঙ্গার ধারে সেই পুরনো বটগাছটা যেন আরও অন্ধকার।

আমি ঘড়ি দেখলাম—১১টা ৫৯

এক মিনিট পরে—
—“আসছিস্…?”

আমার হাত কেঁপে উঠল।
টর্চের আলোয় আমি দেখলাম—বটগাছের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসছে একটা ছায়ামূর্তি।

অধ্যায় ৫ : ছায়ার হাসি

সে মূর্তির চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। ঠোঁটে এক অস্বাভাবিক হাসি।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে আমার দিকে, আর গম্ভীর কণ্ঠে বলছে—

—“এবার… তুই…”

আমি বুঝলাম আমি নড়তে পারছি না।
আমার পা যেন মাটির সঙ্গে আটকে গেছে। বুকের ভেতর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।

হঠাৎ পিছন থেকে কেউ আমার হাত ধরে টেনে নিল—

—“পাগল নাকি! দৌড়!”

আমি ঘুরে দেখি—গ্রামের এক বৃদ্ধ পূজারি, হরিনাথ কাকু।
তিনি আমাকে কাঁধে ফেলে দৌড়ে শ্মশান ছাড়ালেন।

পিছনে শ্মশানের ভেতর থেকে গর্জে উঠল ভয়ঙ্কর কণ্ঠস্বর—
—“তুই ফিরবি…”

অধ্যায় ৬ : পূজারির সতর্কবাণী

কাকু আমাকে নিয়ে তাঁর কুঁড়েঘরে এলেন।
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলাম—“ওটা কী ছিল?”

তিনি গম্ভীর গলায় বললেন—

—“ও শিবুর আত্মা। যেদিন সে মারা গেছিল, নাকি কোনও অজানা শক্তি তাকে গ্রাস করেছিল। তার আত্মা এখন নতুন শিকার খোঁজে। যে তার ডাকে সাড়া দেয়, সে আর বাঁচে না।”

আমি বললাম—“কিন্তু আমি তো ডাক শুনে গিয়েছিলাম, তাও বেঁচে আছি।”

কাকু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
—“আজ আমি ছিলাম বলেই। কিন্তু মনে রেখো ডাক্তারবাবু, ও তোকে ছাড়বে না। একদিন আবার ডাকবে।”

অধ্যায় ৭ : ভয়ঙ্কর রাতগুলোর শুরু

এরপর প্রায় এক মাস হরিপুরে থেকেছি আমি।
প্রতিদিন রাত বারোটার দিকে সেই ডাক শুনতে পেতাম।

কখনও কোয়ার্টারের জানালার বাইরে…
কখনও হাসপাতালের দোতলার বারান্দায়…
কখনও ঠিক আমার কানের পাশে ফিসফিস করে…

—“আসছিস্…?”

ঘুম ভেঙে ঘামে ভিজে উঠতাম।
রোগী দেখার সময়ও মনে হত কেউ আমার পিছন থেকে তাকিয়ে আছে।

গ্রামের মানুষরা দূর থেকে ফিসফিস করে বলত—
—“ওকেও নাকি শ্মশান ডাকছে।”

অধ্যায় ৮ : শেষ চ্যালেঞ্জ

আমি যুক্তিবাদী মানুষ।
আমি মানতে চাইনি যে একটা “আত্মা” আমাকে টেনে নিয়ে যাবে।

তাই শেষবারের মতো সিদ্ধান্ত নিলাম—আমি শ্মশানে ফিরে যাব।
যে রহস্যই হোক, তা উদঘাটন করব।

পূর্ণিমার রাত।
আমি একা শ্মশানে গেলাম। সঙ্গে ছিল টর্চ আর কিছু ঔষধ।

গঙ্গার জলে চাঁদের প্রতিফলন। বাতাসে আগুনে পোড়া কাঠের গন্ধ।
হঠাৎ সেই পরিচিত ডাক—

—“আসছিস্…?”

এবার আমি দৌড়ালাম না। স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম।

ছায়ামূর্তিটা আবার বেরোল বটগাছের তলা থেকে।
চোখে আগুন, ঠোঁটে শয়তানি হাসি।

সে ধীরে ধীরে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
তার শ্বাসে দাউদাউ আগুনের গন্ধ।
তার হাত আমার কাঁধে রেখে সে বলল—

—“আজ… তুই আমার।”

অধ্যায় ৯ : মৃত্যুর ছায়া

আমার শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ মনে হল আমি টেনে নিয়ে যাচ্ছি—কোথাও অন্ধকারের ভেতর।
চোখের সামনে ঝাপসা। বুকের ভেতর হিম শীতলতা।

ঠিক তখনই আবার সেই বৃদ্ধ পূজারির কণ্ঠ শোনা গেল—
—“ওঁ নমঃ শিবায়!”

আমি টলমল চোখে দেখলাম, পূজারি আগুন জ্বালিয়ে মন্ত্র পড়ছেন।
শ্মশানের ভেতর যেন গর্জে উঠল শত শত কণ্ঠস্বর একসাথে।

ছায়ামূর্তি ভয়ঙ্কর চিৎকার করে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম।

অধ্যায় ১০ : আজও সেই ডাক

আজ পাঁচ বছর হয়ে গেছে।
আমি হরিপুর ছেড়ে কলকাতায় ফিরে এসেছি।

তবু, মাঝেমাঝে… রাত বারোটার সময়…
আমার জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে কেউ ফিসফিস করে বলে—

—“আসছিস্…?”

আমি জানি, ও এখনও আমাকে ছাড়েনি।
কেবল সময়ের অপেক্ষা করছে…

Sharing Is Caring:

Bhutikstory is a Professional Entertainment Platform. Here we will only provide you with interesting content that you will enjoy very much. We are committed to providing you the best of Entertainment, with a focus on reliability and Blog.I will keep on posting such valuable anf knowledgeable information on my Website for all of you. Your love and support matters a lot.Thank you For Visiting Our Site

Leave a Comment