নিশির ছায়া – শ্মশানপাড়ার রহস্যময় রাত | Horror Stories in Bengali | Bangla Bhuter Golpo

বাংলার গ্রাম মানেই কুয়াশা ঢাকা রাস্তা, তালগাছের ছায়া আর রাত নামলেই অদ্ভুত শব্দ। লোককথায় শোনা যায়—নিশির ডাক যদি কেউ শোনে আর সেই ডাকে সাড়া দেয়, তবে তার জীবন আর বাঁচে না। কিন্তু এগুলো কি শুধুই গল্প? নাকি সত্যিই রাতের আঁধারে অশুভ কিছু সক্রিয় হয় ?

আজকের গল্প “নিশির ছায়া” সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে।

অধ্যায় ১ – কাশিপুরের অশুভ কাহিনি

কাশিপুর নামটা শুনলে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক শান্ত, নির্জন গ্রাম। চারদিক জুড়ে ধানক্ষেত, সরু কাঁচা রাস্তা, মাঝেমধ্যেই খেজুরগাছের সারি। সকাল-বিকেল নদীর ধারে বউঝিদের কাপড় ধোয়ার কলকল শব্দ, মাঠে কৃষকদের হাঁকডাক, সন্ধ্যা নামলেই শাঁখ বাজানো—সব মিলিয়ে যেন ছবির মতো শান্ত পরিবেশ।

কিন্তু এই শান্ত গ্রামটারই এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার দিক আছে। গ্রামের শেষ প্রান্তে, যেখানে বাঁশঝাড় আর তালগাছ মিলিয়ে অদ্ভুত ছায়া তৈরি করেছে, সেখানে রয়েছে এক পুরনো শ্মশান। অনেকে বলে, বহু বছর আগে ওই শ্মশানে এক ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছিল। সেই থেকেই জায়গাটা অভিশপ্ত হয়ে গেছে।

প্রবীণরা প্রায়ই গ্রামের ছেলেমেয়েদের সতর্ক করে দিতেন—

সন্ধ্যার পর ওই শ্মশানপাড়ার দিকে যেও না। নিশি ডেকে নেবে।
নিশির ডাক—এই শব্দটা কাশিপুরে শিশু থেকে বৃদ্ধ, সবাই জানত। কথিত আছে, নিশি হলো এক অশুভ আত্মা, যে মানুষের পরিচিত কারও কণ্ঠে ডাক দেয়। যদি কেউ সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বাইরে যায়, তবে আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

জয়ের ঠাকুমা প্রায়ই বলতেন—

আমি নিজের চোখে দেখেছি রতন মাস্টারকে নিশি ডেকে নিয়ে গেল। রাতের বেলা ঘর থেকে বেরোতে দেখেছিলাম। সকালে শুধু তার গায়ের জামাটা পাওয়া গেল শ্মশানের ধারে।
গ্রামের মানুষ এইসব গল্পে আতঙ্কিত হলেও জয় এসব বিশ্বাস করত না। সদ্য কলেজে পড়া, শহরের বইপত্রে পড়া আধুনিক বিজ্ঞান তার মাথায় গেঁথে গেছে। ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই, সবই মানুষের কল্পনা—এই ছিল তার বিশ্বাস।

তবু মনের ভেতর একটা কৌতূহল তার সবসময় কাজ করত। নিশির ডাক কি সত্যিই আছে? শ্মশানটা কি সত্যিই অভিশপ্ত?

অধ্যায় ২ – বাজি ধরা


শীতকাল তখন প্রায় মধ্যগগনে। ডিসেম্বরের কাশিপুরে রাত নামলে গ্রাম ঢাকা পড়ে যায় কুয়াশায়। কুয়াশার ফাঁক দিয়ে ম্লান চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম্য মাঠে, আর বাঁশঝাড়ের মাথায় মাঝে মাঝে শেয়ালের ডাক শোনা যায়।

এমনই এক রাতে জয় বসেছিল তার দুই বন্ধু—অর্ণব আর সাগরের সঙ্গে। তিনজনই ছিল গ্রামের একচিলতে চায়ের দোকানে। দোকানের মালিক তখন চুল্লিতে চা চাপিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। চারপাশে আর কোনো ক্রেতা নেই।

আড্ডার ফাঁকে গল্প ঘুরে এল গ্রামের সেই নিষিদ্ধ জায়গার দিকে।

অর্ণব চায়ের কাপ হাতে নিয়ে হেসে বলল—

শোন জয়, তুই তো সবসময় বলে বেড়াস ভূত-টুত বলে কিছু নেই। তাহলে ওই শ্মশানে একবার রাত কাটিয়ে প্রমাণ কর না?
সাগর একটু চমকে উঠল। গম্ভীর গলায় বলল—

তুই কি পাগল নাকি? ওখানে গিয়ে রাত কাটানো যায়? মানুষ আজও নিখোঁজ হয় ওখান থেকে। শুনিসনি কি, গতবছর শম্ভু দত্তের ছেলেটাকে কিভাবে খুঁজে পাওয়া গেল না?
অর্ণব খিলখিল করে হেসে উঠল।

আরে ওসব গাঁয়ের বুড়োদের বানানো গল্প। আর যদি না হয়, তবে জয় তোদের মতো ভীতু নয়। তাই না জয়?
জয় ঠোঁট উলটে সোজা হয়ে বসে বলল—

অবশ্যই। আমি তো এসব বাজে কুসংস্কার মানি না। ভূত বলে কিছু নেই। সবই মানুষের ভ্রম।
সাগর মৃদু কাঁপা গলায় বলল—

ভ্রম বলছিস? আমার ঠাকুরদা নিজের চোখে দেখেছেন নিশির ডাক। রাতে নিজের স্ত্রীর গলায় ডাক শুনে তিনি বেরিয়ে গেছিলেন। সকালে নদীর ধারে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছিল।
জয় একটু হেসে গম্ভীর গলায় উত্তর দিল—

ওসব গল্প। মৃত্যু হলে মানুষ কোনো কারণেই মরে যেতে পারে। ভূত-টুত কিছু নেই। আমি চাইলে আজই প্রমাণ করতে পারি।
অর্ণব তৎক্ষণাৎ সুযোগ লুফে নিল।

চল তবে বাজি ধরি। আজ রাতেই তুই যদি শ্মশানে গিয়ে দাঁড়াতে পারিস, তাহলে তোর সাহসকে আমি স্যালুট করব। না পারলে… তুই আমাদের সবার সামনে মানতে হবে, তুই ভীতু।
জয় এক মুহূর্তের জন্যও দোটানায় পড়ল না।

ঠিক আছে। আজ রাত বারোটায় আমি শ্মশানের গেটে দাঁড়াবো। চাইলে তোরাও সঙ্গে চল।
অর্ণব উৎসাহিত হয়ে হেসে উঠল।
সাগর হতভম্ব হয়ে দুজনের দিকে তাকাল।

তোমরা কি সত্যিই সিরিয়াস? শ্মশান মানে কিন্তু খেলার জায়গা নয়। ওই জায়গাটা শুধু ভৌতিক না, ভয়ানকও বটে।
জয় গম্ভীরভাবে সাগরের কাঁধে হাত রেখে বলল—

ভয় পাস না। সব প্রমাণ হয়ে যাবে আজ রাতেই।
চায়ের দোকানের মালিক তখনো চুপচাপ বসে ছিল। কিন্তু কথোপকথন শুনে হঠাৎ সে গম্ভীরভাবে বলল

তোমরা কী সব আজেবাজে বাজি ধরছ? শ্মশান জায়গাটা ভালো না। আমি বহুবার শুনেছি সেখানে রাতের বেলা অদ্ভুত কান্নার শব্দ ভেসে আসে। অনেকেই আর ফিরে আসেনি। যা করার, ভোরবেলা কোরো। রাতে নয়।
জয় হেসে উত্তর দিল—

কাকু, ভয় পাবেন না। আমি শুধু সত্যিটা জানতে চাই। ভূত যদি থেকে থাকে তবে আমার চোখে পড়ুক। না থাকলে প্রমাণ হবে এগুলো সব গুজব।
চায়ের দোকানদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার খবরের কাগজে চোখ দিল।
অর্ণব তখন জয়কে উদ্দেশ্য করে বলল—

তাহলে ঠিক হলো। আজ রাত বারোটায় আমরা তিনজন শ্মশানের পথে রওনা দেব।
সাগর কাঁপা গলায় বিড়বিড় করে বলল—

হায় ভগবান… যা হতে চলেছে, ভালো হবে না।
এভাবেই অজান্তেই শুরু হলো তিন তরুণের জীবনের এক ভয়ঙ্কর অধ্যায়।


অধ্যায় ৩ – কুয়াশার ভেতর যাত্রা

ঘড়ির কাঁটা যখন বারোটার ঘরে পৌঁছাল, তখন কাশিপুর গ্রামটা একেবারেই অচেনা হয়ে গিয়েছিল। কুয়াশার চাদরে মুড়ে গেছে গোটা গ্রাম। দূরে দূরে তালগাছের মাথা অস্পষ্ট ছায়ার মতো দুলছিল। কোথাও কুকুরের হুক্কাহুয়া ডাক ভেসে আসছিল, আবার কোথাও নিস্তব্ধতা এত গভীর ছিল যে নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দও শোনা যাচ্ছিল।

জয়, অর্ণব আর সাগর—তিনজন বেরোল কুয়াশার ভেতর দিয়ে। হাতে ছিল শুধু তিনটে টর্চলাইট। সাগরের হাতে টর্চ কাঁপছিল বারবার, যেন ভয় তার শরীরকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

অর্ণব হেসে ঠাট্টা করল—

এই সাগর, টর্চটা এমন কাঁপাচ্ছিস কেন? ভূত তোকে দেখে ভয় পেয়ে পালাবে।
সাগর বিরক্ত গলায় উত্তর দিল—

এটা ঠাট্টার সময় নয় অর্ণব। বুকটা কেমন যেন ধড়ফড় করছে। মনে হচ্ছে আমাদের কেউ অনুসরণ করছে।
জয় শান্ত গলায় বলল—

এটা কেবলই ভয়। রাতের নীরবতায় মন নানা ভ্রম তৈরি করে। আমরা একাই হাঁটছি।
কিন্তু সাগরের কথা অমূলক ছিল না। তাদের তিনজনের পদধ্বনি ছাড়াও যেন অদৃশ্য আরেকটা ছায়া পায়ের আওয়াজ তৈরি করছিল। কুয়াশার ভেতর থেকে বারবার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তাদের পিছু নিচ্ছে।

পথটা ধীরে ধীরে গ্রাম থেকে বেরিয়ে মাঠের দিকে গড়াল। বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে রাতের বাতাস শোঁ শোঁ করে বইছিল। কোথাও আবার অদ্ভুত ফিসফিস শব্দ যেন কানে ভেসে আসছিল।

হঠাৎ দূরে শিয়ালের হাহাকার শুনে অর্ণব থমকে দাঁড়াল।

শোন! কেমন যেন অদ্ভুত আওয়াজ হচ্ছে না?
জয় একটু হেসে বলল—

শিয়ালের ডাক। এ আর নতুন কি?
কিন্তু সাগর কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল—

না, এটা শুধু শিয়াল নয়। এর মাঝে যেন মানুষের কান্নার শব্দও মিশে আছে।
তিনজন থেমে কান পেতে রইল। সত্যিই, কুয়াশার ভেতর থেকে যেন কারও হাহাকার ভেসে আসছে—অস্পষ্ট, করুণ, বুক কাঁপানো এক দীর্ঘশ্বাস।

অর্ণবের মুখে হাসি মিলিয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে জয়ের দিকে তাকাল।

জয়… তুই বলিস ভূত নেই। কিন্তু এ আওয়াজটা কী?
জয় গম্ভীর গলায় উত্তর দিল—

শ্মশানের কাছে যাচ্ছি তো, হয়তো বাতাসে অদ্ভুত শব্দ তৈরি হচ্ছে। ভয় পাস না।
কিন্তু তার নিজের বুকের ভেতরেও অদ্ভুত একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল।

রাস্তা যত শ্মশানের দিকে এগোতে লাগল, ততই কুয়াশা ঘন হতে লাগল। টর্চের আলোয় সামনে কয়েক হাতের বেশি দেখা যাচ্ছিল না। চারপাশে নিস্তব্ধতা এতটাই অস্বাভাবিক হয়ে উঠল যে একে অপরের শ্বাস-প্রশ্বাসও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।

হঠাৎ পিছন থেকে কারও হাঁটার শব্দ এল—খুব ধীর, টেনে আনা পায়ের শব্দ। তিনজন একসঙ্গে পিছনে তাকাল। কিছুই নেই। শুধু কুয়াশার ঘূর্ণি।

সাগর ঘামতে ঘামতে বিড়বিড় করে উঠল—

আমি বলেছিলাম না? আমাদের কেউ অনুসরণ করছে।
অর্ণব এবার আর কিছু বলল না। তার চোখেও ভয় নেমে এসেছে।

জয় কেমন যেন নিজের অজান্তেই গলার স্বর নিচু করে বলল—

চল, তাড়াতাড়ি এগোই। এখন আর ফিরতে পারব না।
তিনজন দ্রুত পা বাড়াল। কুয়াশার ঘনত্ব এতটাই বেড়ে গেল যে রাস্তার বাঁশঝাড়গুলোও যেন অদ্ভুত দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে।

শ্মশানের ফটক তখন আর কয়েক পা দূরে।

অধ্যায় ৪ – অদ্ভুত ডাক

শ্মশানের ফটক পেরিয়ে তিনজন ভেতরে পা রাখতেই চারদিক যেন আরও বেশি অন্ধকার হয়ে গেল। কুয়াশার চাদর এতটাই ঘন যে টর্চের আলোও যেন গিলে নিচ্ছে। পুরনো ভাঙাচোরা শিবমন্দিরের ধ্বংসস্তূপ দাঁড়িয়ে আছে এক কোণে, আর চারপাশে শুকনো শাখাগুলো কঙ্কালসার হাতের মতো হাওয়ায় দুলছে।

শ্মশানের ভিতর পা রাখা মাত্রই বাতাস কেমন যেন ভারী হয়ে গেল।
একটা অদ্ভুত চাপা গন্ধ—অর্ধপোড়া কাঠ আর মাংসের মিশ্রিত গন্ধ—তাদের নাকে এসে লাগল।

অর্ণব টর্চের আলো মাটির দিকে ফেলতেই দেখতে পেল পোড়া কাঠের ছাই এখনও সাদা হয়ে ছড়িয়ে আছে।

এতদিন ধরে শ্মশান ফাঁকা পড়ে আছে বলে শুনেছিলাম… কিন্তু এখানে তো কাল-পরশু কেউ চিতা দিয়েছে মনে হচ্ছে।
সাগরের বুক কেঁপে উঠল।

মানে… এখনও এখানে মানুষ আসে?
জয় ঠোঁট চেপে রাখল। ভিতরে ভিতরে সে-ও কেমন যেন অস্বস্তি টের পাচ্ছিল।

ঠিক সেই সময়—

একটা কণ্ঠ ভেসে এল।

খুব পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর।

জয়… জয়… এখানে আয়…
জয় জমে গেল। এ যে তার মৃত কাকার গলা! যিনি কয়েক বছর আগে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছিলেন।

অর্ণব কেঁপে উঠে ফিসফিস করে বলল—

জয়… তোর কাকার গলা না এটা?
জয়ের ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। চোখ কপালে উঠে গেছে।

কিন্তু… উনি তো মরে গেছেন…
সাগর ভয় পেয়ে হাঁটু কাঁপাতে লাগল।

আমি বলেছিলাম না! নিশির ডাক! এটাই নিশির ডাক! চল পালাই…
বলেই সাগর হঠাৎ দৌড়ে পালাল। তার টর্চ আলো কুয়াশার ভেতর মিলিয়ে গেল।

শ্মশানে তখন শুধু জয় আর অর্ণব।

আবার সেই কণ্ঠস্বর ভেসে এল—এবার আরও স্পষ্ট, আরও জোরে।

জয়… আমার কাছে আয়… আমি তোর জন্য অপেক্ষা করছি…
অর্ণব হাত কাঁপতে কাঁপতে বলল—

এটা স্বাভাবিক নয় জয়। চল এখুনি ফিরে যাই। দেরি হলে আমরাও আর ফিরতে পারব না।
কিন্তু জয় যেন মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। পা নিজের অজান্তেই এগোতে শুরু করল সেই কণ্ঠস্বরের দিকে। চোখদুটো নিস্তেজ হয়ে গেছে, শরীর যেন কারও অদৃশ্য টানে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

অর্ণব মরিয়া হয়ে জয়ের হাত চেপে ধরল।

পাগল হোস নাকি? এটা তোকে ডাকছে মরণের দিকে! তুই যদি যাস, তোরও দেহ পাওয়া যাবে না কাল সকালে।
ঠিক তখনই—

শ্মশানের অন্ধকার দিক থেকে একটা মৃদু কান্নার আওয়াজ শোনা গেল।
শিশুর মতো কান্না।

তারপর হঠাৎ সেটা রূপ নিল অদ্ভুত রক্ত জমাট বাঁধা আর্তনাদে—

আssssssআহহহহহহহহহ…
চারদিক থেকে যেন অজানা নারীকণ্ঠ ভেসে আসতে লাগল। কখনো হাসি, কখনো কান্না, কখনো ফিসফিসানি।

কুয়াশার মধ্যে কারও অস্পষ্ট ছায়া দুলতে লাগল—কখনো মনে হয় এক বৃদ্ধা, কখনো মনে হয় এক যুবতী, আবার কখনো মনে হয় কারও মাথাই নেই।

অর্ণব চিৎকার করে উঠল—

জয়! এ জায়গা আমাদের জন্য নয়। চল!

কিন্তু জয় যেন পুরোপুরি অন্য এক জগতে ঢুকে পড়েছে। কণ্ঠস্বরটা তাকে নিজের দিকে টানছে, টানছে, আরও গভীর শ্মশানের ভিতর…

অধ্যায় ৫ – শ্মশানের ভিতর

শ্মশানের ভিতরটা যেন ধীরে ধীরে ভিন্ন এক জগতে পরিণত হচ্ছিল। অর্ণব টেনে ধরে রাখলেও জয় যেন অচেনা কোনো শক্তির কবলে পড়েছে। তার পা থামছিল না, অদ্ভুত এক টানে সে এগোতে থাকল শ্মশানের মাঝখানের দিকে।

অর্ধেক ভাঙা ঘাটের ধারে পৌঁছে তারা দুজনই স্থির হয়ে গেল।

কারণ চোখের সামনে যা দেখা গেল, সেটাকে ভাষায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব।

একটা চিতা, যেটা বহু আগে জ্বালানো হয়েছিল হয়তো, সেখানে এখনও আগুন জ্বলছিল। আগুনের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অর্ধপোড়া কাঠ। আর সেই আগুনের পাশে বসে আছে—এক অর্ধপোড়া দেহ।

দেহটা কাঁধ পর্যন্ত পুড়ে গেছে, মাংস গলে হাড় বেরিয়ে এসেছে, কিন্তু মুখের অর্ধেক অংশ অক্ষত। চোখদুটো যেন কয়লার মতো জ্বলছে, ভেতর থেকে আগুনের লেলিহান শিখা বেরোচ্ছে।

জয় আর অর্ণব অবশ হয়ে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ সেই দেহ মাথা তুলে তাকাল তাদের দিকে।

তারপর ফিসফিস করে বলল—

আমাকে মুক্তি দে… আমি আটকে আছি… আমাকে মুক্তি দে…
অর্ণবের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। সে কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল—

জয়… এটা মানুষ নয়… এটা প্রেত… চল পালাই…
কিন্তু জয় যেন অবশ হয়ে গেছে। তার ঠোঁট কাঁপছে, চোখ বিস্ফারিত, গলা শুকিয়ে কাঠ।

প্রেতটা ধীরে ধীরে দাঁড়াল। দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হাড়গোড় ভাঙার মত শব্দ হলো। তার শরীর থেকে গরম ধোঁয়া উঠছে।

সে ধীরে ধীরে জয়ের দিকে এগোতে লাগল।
প্রতিটি পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে শ্মশানের মাটিতে যেন দপ করে আগুন জ্বলে উঠছিল।

প্রেত আবার বলল—

আমাকে কেউ শেষ করেনি… আমাকে মাঝপথে ফেলে রেখেছে… আমার মুক্তি হয়নি… তাই আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি…
তারপর হঠাৎ কণ্ঠস্বরটা বদলে গেল—চিৎকারের মতো ভরাট, গর্জনময়।

তুই এসেছিস… তুই আমার মুক্তি দিবি… নইলে তোকেও নিয়ে যাব!
অর্ণব আতঙ্কে কেঁদে ফেলল।

জয়, চল! না হলে শেষ!
কিন্তু জয় যেন শূন্যের দিকে তাকিয়ে আছে। কণ্ঠস্বরটা তাকে পুরোপুরি মোহাবিষ্ট করে ফেলেছে। তার শরীর টলছে, চোখদুটো নিস্তেজ, যেন সে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।

চারপাশে হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল। আগুন আরও দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। শ্মশানের বাঁশঝাড়গুলো হাহাকার করতে লাগল।

জয়ের কানে স্পষ্ট ভেসে আসতে লাগল শত শত গলার আওয়াজ—

আমাদের মুক্তি দে… আমরা বন্দি… আমাদের মুক্তি দে…
অর্ণব কাঁপতে কাঁপতে জয়ের হাত ধরে টান দিল, কিন্তু জয় এক ইঞ্চিও নড়ল না। বরং যেন অদৃশ্য কারও টানে সে এগোতে লাগল সেই অর্ধপোড়া দেহটার দিকে।

অধ্যায় ৬ – মৃত্যুর কবল

শ্মশানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে জয় যেন সম্পূর্ণ জাদুমন্ত্রে বাঁধা পড়েছে। তার চোখ শূন্য, ঠোঁট নিস্তব্ধ। অর্ণব বারবার হাত টেনে বলছে—

জয়! দয়া করে চলো! না হলে কিছু একটা হয়ে যাবে…
কিন্তু জয় শুনতে পাচ্ছে না। অদ্ভুত মোহময়ী শক্তি তাকে টেনে নিচ্ছে সেই অর্ধপোড়া প্রেতাত্মার দিকে।

প্রেতের অদ্ভুত শক্তি

হঠাৎ মাটির নিচ থেকে গড়গড় শব্দ উঠল। যেন কেউ মাটি খুঁড়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশের পোড়া চিতার ছাই থেকে সাদা সাদা হাড়গোড়ের হাত বেরিয়ে আসতে লাগল।

একটা, দুটো নয়… অসংখ্য হাত।
কঙ্কালের মতো শুকনো হাত, লম্বা নখ, পোড়া ছাইতে ঢাকা।

ওরা জয়কে আঁকড়ে ধরল।
তার পা থেকে শুরু করে বুক পর্যন্ত হাড়ের আঙুলগুলো পেঁচিয়ে ধরল তাকে।

অর্ণব চিৎকার করে উঠল—

না! ছেড়ে দে! ছেড়ে দে ওকে!
কিন্তু সে একাই কী করবে? তার চারপাশেও হাত উঠে এসেছে। অর্ণব মরিয়া হয়ে লাথি মারছে, চিৎকার করছে, কিন্তু প্রতিটি চিৎকার যেন বাতাস গিলে নিচ্ছে।

মৃত্যুর ছায়া

জয় তখন পুরোপুরি আতঙ্কে কাঁপছে।
কিন্তু তার মুখ থেকে কোনো আওয়াজ বেরোচ্ছে না। যেন গলা শুকিয়ে গেছে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।

সেই অর্ধপোড়া দেহটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার আগুনঝরা চোখ জয়ের চোখের সঙ্গে আটকে গেল।

হঠাৎ তার ভাঙা কণ্ঠস্বর শোনা গেল—

আমি যখন বেঁচে ছিলাম, আমাকে কেউ সৎকার দিল না… আমাকে মাঝপথে ফেলে রেখেছিল… আমার আত্মা আটকে আছে… তুই আমার মুক্তির পথ… তোকে নিয়েই আমি যাব…
তারপরই হাড়গোড়ের হাতগুলো জয়ের বুকের ভেতরে ঢুকে যেতে লাগল। জয় বীভৎস চিৎকার করে উঠল—

আআআআহহহহহ!!
চিৎকারটা এত তীব্র ছিল যে শ্মশানের চারপাশে থাকা শকুনগুলো আকাশে উড়ে গেল, কুকুরগুলো হাহাকার করে পালাল।

অর্ণবের অসহায়তা
অর্ণব মরিয়া হয়ে জয়ের হাত ধরল।

না জয়! তুই হার মানতে পারিস না! লড়াই কর! ওদের দিস না!
সে টেনে বের করার চেষ্টা করল, কিন্তু যত টানছে, জয় তত ডুবে যাচ্ছে সেই হাড়গোড়ের জালে।

তার বুক থেকে ধীরে ধীরে ধোঁয়া বেরোতে লাগল, যেন প্রাণশক্তি টেনে নিচ্ছে অদৃশ্য কেউ।

প্রেতটা তখন গর্জে উঠল—

এবার তুই আমার… কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না!
অর্ণব চিৎকার করে উঠল—

কেউ আছে! আমাদের বাঁচাও!
হঠাৎ অদ্ভুত আলো
ঠিক সেই মুহূর্তে, শ্মশানের দূরে মন্দিরের ঘণ্টার শব্দ ভেসে এলো।
ঠকঠক করে একটার পর একটা ঘণ্টাধ্বনি।

সঙ্গে ভেসে এল শাঁখ বাজানোর আওয়াজ।
অর্ণব আর জয় দুজনেই মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল।

আলো যেন কোথা থেকে এসে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
সেই আলোতে প্রেতটা পিছিয়ে গেল, কাঁপতে লাগল।

তার আগুনঝরা চোখ নিভে আসতে লাগল।
হাড়গোড়ের হাতগুলো একে একে ভেঙে ছাই হয়ে পড়ল।

জয় মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, হাঁপাতে লাগল। তার চোখ থেকে পানি ঝরছে, বুক উঠছে-নামছে।

প্রেতটা শেষবারের মতো গর্জন করে বলল—

তুই এ যাত্রায় বেঁচে গেলি… কিন্তু এটা শেষ নয়… আমি আবার ফিরব…
তারপর ধোঁয়ার ভেতর মিলিয়ে গেল।

ভয়ঙ্কর রাতের সমাপ্তি?
অর্ণব কাঁপতে কাঁপতে জয়ের মাথা কোলে নিল।

তুই বেঁচে আছিস… ঈশ্বরের কৃপায় তুই বেঁচে গেছিস…
জয় কাঁপা গলায় বলল—

ও এখনও শেষ হয়নি অর্ণব… আমি ওর চোখে দেখেছি… সে আবার আসবে… হয়তো আমাকেই চাইছে…।
চাঁদের আলোয় শ্মশানের নিস্তব্ধতা ফিরে এল।
কিন্তু অর্ণব আর জয় জানত—ওদের জীবনে স্বাভাবিকতা আর কখনও ফিরবে না।






Sharing Is Caring:

Bhutikstory is a Professional Entertainment Platform. Here we will only provide you with interesting content that you will enjoy very much. We are committed to providing you the best of Entertainment, with a focus on reliability and Blog.I will keep on posting such valuable anf knowledgeable information on my Website for all of you. Your love and support matters a lot.Thank you For Visiting Our Site