“রাত নামছে… দূরে বাঁশবনের মধ্যে বাতাসে একটা হালকা শো শো আওয়াজ…
মাটির রাস্তা ধরে একা হাঁটছে মানুষটা… তার হাতে একটা লণ্ঠন…
হঠাৎ সে থেমে যায়…
কারণ — দূরে কেউ ডাকছে তাকে… কুয়াশার ভেতর থেকে…”
অধ্যায় ১: ভোরবেলার চিঠি
নাম অরিন্দম। পেশায় স্কুল শিক্ষক।
গ্রামের নাম চণ্ডিপুর — নদীর ধারে এক পুরনো গ্রাম, যার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে শুকিয়ে যাওয়া এক খাল, নাম “বাউলখাল”।
শহর থেকে এখানে বদলি হয়ে আসার পর থেকেই অরিন্দমের মনটা অদ্ভুত অস্থির হয়ে উঠেছিল।
স্কুলটা পুরনো, কাঠের বেঞ্চ, ছাতের মধ্যে বাদুড়ের বাসা, আর সকালবেলায় কুয়াশার মধ্যে ঘন্টা বাজলে চারপাশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
একদিন ভোরে, অরিন্দম ডাকপিয়নের হাতে পেল একটা চিঠি।
চিঠিতে লেখা —
“মাস্টারমশাই,
আজ রাতে আপনি যদি পারেন, আসবেন বাউলখালের ধারে।
কিছু কথা আছে।
– হরিপদ মাঝি”
হরিপদ মাঝি গ্রামেরই মানুষ, কিন্তু গত দুই সপ্তাহ ধরে সে নিখোঁজ।
কেউ বলে নদীতে পড়ে গেছে, কেউ বলে ‘ওকে নাকি শাঁখচুন্নি টানতে নিয়ে গেছে’। (Sunday Suspense)
অরিন্দম অবাক হল —
যে মানুষ দু’সপ্তাহ আগে হারিয়ে গেছে, তার নামে আজ চিঠি এল!
অধ্যায় ২: বাউলখালের কুয়াশা
রাত ন’টা।
গ্রামের লোকেরা তখন অনেক আগেই ঘরে ঢুকে গেছে। বাইরে শুধু শিয়ালের ডাক আর বাতাসের আওয়াজ।
অরিন্দম হাতে লণ্ঠন নিয়ে বেরোল।
পথটা একটাই — মাটির রাস্তা ধরে বাঁশবন পেরিয়ে বাউলখাল।
চাঁদের আলো নেই, শুধু কুয়াশা।
হাঁটতে হাঁটতে সে অনুভব করল —
বাতাসে একটা অদ্ভুত গন্ধ। যেন পচা ফুল আর ধূপের মিশ্রণ।
খালের ধারে পৌঁছে দেখল, জলের ধারে একটা পুরনো নৌকা বাঁধা,
আর তার পাশে দাঁড়িয়ে কেউ একজন…
নিশির ছায়া – শ্মশানপাড়ার রহস্যময় রাত | Horror Stories in Bengali | Bangla Bhuter Golpo
— “কে ওখানে?”
লণ্ঠনের আলোয় মুখটা দেখা গেল।
চোখ বড় বড়, মুখ শুকনো, আর ঠোঁটে এক হালকা হাসি।
“আমি হরিপদ মাঝি… আপনি এলেন তো মাস্টারমশাই?”
অরিন্দম গলা শুকিয়ে গেল।
“তুমি তো… তুমি তো…”
হরিপদ হেসে বলল,
“সবাই তাই বলে। কিন্তু আমি মরে যাইনি মাস্টারমশাই… কেউ আমাকে টেনে নিয়েছিল, ওখানে… খালের তলায়।”
অরিন্দম ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
লণ্ঠনের আলোয় দেখতে পেল — হরিপদের পায়ের নিচে কাদা নয়, জল ঝরছে, আর পায়ের তলায় জমি নেই।
“আজ রাতেই সে আসবে… তোমাকেও ডাকবে… ওর ডাক না শুনে পারবে না মাস্টারমশাই…”
এবং এর পরেই —
হঠাৎ বাতাসে একটা ঠান্ডা ঝাপটা, লণ্ঠনের আলো নিভে গেল।
অধ্যায় ৩: শ্মশানের গন্ধ
অরিন্দম দৌড়ে বাড়ি ফিরল।
কিন্তু পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে অবাক হয়ে গেল —
তার জামাকাপড় কাদা আর নদীর কচুরিপানায় ভরা।
সে কি সত্যিই বাউলখাল গিয়েছিল? নাকি সবই স্বপ্ন?
বাইরে বেরিয়ে দেখল গ্রামের চায়ের দোকানে ভিড়।
সেখানে সবাই আলোচনা করছে —
“বাউলখালে আজ ভোরে হরিপদ মাঝির লাশ ভেসে উঠেছে!”
অরিন্দমের মাথা ঘুরে গেল।
সে কি তাহলে… রাতের বেলায় একটা মৃত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছিল?
সেই দিন স্কুলে পড়াতে গিয়ে সে কাঁপছিল।
ছাত্ররা লক্ষ্য করল — মাস্টারমশাই মাঝে মাঝে হঠাৎ চুপ করে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকেন, যেন কেউ ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। (Bhutik Story)
অধ্যায় ৪: রাতের পদচিহ্ন
পরের দিন রাতে অরিন্দম ঘুমোতে গেল দেরিতে।
ঘরের বাইরে তখন ঝিঁঝিঁর ডাক, মাঝে মাঝে বাতাসে জানলার কাঁপুনি।
ঠিক তখনই —
মাটির দিক থেকে একটা খসখস শব্দ।
অরিন্দম উঠে জানালা দিয়ে তাকাল —
ঘরের দরজার সামনে কাদা ভর্তি দুই পায়ের ছাপ!
যেন কেউ এখনই জল থেকে উঠে এসেছে।
সে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল, কান পেতে শুনল…
বাইরে কেউ হালকা গলায় বলছে —
“মাস্টারমশাই… আমি আবার এলাম… আজ আপনাকে নিয়ে যাব…”
হঠাৎ দরজাটা নিজে থেকেই কাঁপতে শুরু করল।
কাঠের কপাটে ধাক্কা, ধুমধুম শব্দ।
অরিন্দম আতঙ্কে জানলার দিক দিয়ে তাকাতেই দেখল —
কুয়াশার ভেতর থেকে হরিপদের মুখ উঁকি মারছে।
চোখদুটি আগুনের মত লাল।
অধ্যায় ৫: গোপাল ঠাকুরের উপদেশ
পরদিন সকালে অরিন্দম ছুটে গেল গ্রামের পুরোহিত গোপাল ঠাকুরের বাড়ি।
সব কথা শুনে ঠাকুরমশাই বললেন—
“ওখানে এক সময় ছিল শ্মশান।
বাউলখালের ধারে পুরনো এক চণ্ডীমণ্ডপে অনেক বছর আগে এক বিধবার আত্মহত্যা হয়েছিল।
তারপর থেকে প্রতি পূর্ণিমায় সে খালের ধারে ডাকে… যাকে ডাকে, সে ফিরে আসে না।”
অরিন্দম ভয়ে বলল, “তাহলে আমি এখন কী করব?”
ঠাকুরমশাই একটা মন্ত্র লিখে দিলেন, সঙ্গে একটা লাল সুতো বেঁধে বললেন —
“আজ রাতে ও ডাকবে, তুমি কোনো অবস্থাতেই সাড়া দেবে না।
কান বন্ধ করে বসে থাকবে, আর এই মন্ত্রটা জপ করবে।”
অধ্যায় ৬ : শেষ রাত
রাত বারোটা।
বাইরে ঘন কুয়াশা, বাতাসে নদীর কাদা গন্ধ।
অরিন্দম জানালার পাশে বসে লণ্ঠন জ্বালিয়ে বই খুলে বসেছে, কিন্তু মন তার স্থির নয়।
চোখের সামনে ভেসে উঠছে হরিপদের মুখ।
ঠিক তখনই…
বাইরে আবার সেই কণ্ঠ —
“মাস্টারমশাই… দরজা খোলো…”
সে কান বন্ধ করে বসে রইল।
কিন্তু ডাকটা এবার আরও কাছে এল —
“দেখো, আমি তোমার ছাত্রদের নিয়ে এসেছি… ওরা তোমাকে ডাকছে…”
অরিন্দম চমকে উঠল —
ছোট ছোট গলার আওয়াজ – “স্যার… দরজা খোলেন…”
তার বুকের ভেতর ঠকঠক করে উঠল।
সে চোখ বন্ধ করে মন্ত্র জপ করতে লাগল।
কিন্তু হঠাৎ —
বাইরের লণ্ঠনের আলো নিভে গেল, ঘরে অন্ধকার।
আর অন্ধকারের মধ্যে কানে আসছে শীতল এক হাসি…
“তুমি বাঁচতে পারবে না মাস্টারমশাই… আমি তো তোমার ভেতরে আছি এখন…”
অরিন্দম চিৎকার করে উঠল…
তারপর নিস্তব্ধতা।
অধ্যায় ৭ : পরের সকাল
পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা অরিন্দমের ঘরে ঢুকে দেখল —
সে মেঝেতে পড়ে আছে, চোখ খোলা, মুখে একটা হালকা হাসি।
কিন্তু তার হাতে শক্ত করে ধরা লাল সুতোটা ছিঁড়ে গেছে।
গোপাল ঠাকুর বললেন,
“ওর আত্মা শান্তি পায়নি। হয়তো ওর ডাকে সাড়া দিয়ে ফেলেছিল।”
বাউলখালের ধারে আজও নাকি রাতে কেউ হাঁটলে শোনে—
“মাস্টারমশাই… থামুন… আমাকে চিনলেন না?”
আর বাতাসে ভেসে আসে সেই কুয়াশার গন্ধ…
পচা ফুল, ধূপ, আর এক হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠের ডাক…
সমাপ্তি
“রাত যখন গভীর হয়,
কুয়াশা ঘন হয়ে আসে…
তখনও কি আপনি হাঁটেন একা নদীর ধারে?
যদি কখনও কেউ আপনাকে ডাকে…
পেছন ফিরে তাকাবেন না।
কারণ — কে জানে, সেই ডাক…
মানুষের, না অন্য কারও।”
Read More Post
নিশির ছায়া – শ্মশানপাড়ার রহস্যময় রাত | Horror Stories in Bengali | Bangla Bhuter Golpo
শ্মশানের ডাক – বাংলা গল্প | Horror Stories in Bengali | Bangla Bhuter Golpo

2 thoughts on “কুয়াশার ভেতর রাতের ডাক – একটি গ্রামীণ ভৌতিক কাহিনি | Bangla Bhuter Golpo”