শীতের শেষ দিক। কলকাতার আকাশে তখনও সূর্য নামেনি, তবু জানালার কাচ ঠেলে ভেতরে ঢুকছে ধোঁয়াটে সাদা আলো। আমি, সৌম্য চক্রবর্তী, ডেস্কে বসে দিনের প্রথম কফিটা চুমুক দিচ্ছি। কীবোর্ডে আঙুল ছুটছে—নতুন সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট জমা দেওয়ার ডেডলাইন আজ রাতেই। এমন সময় দরজায় ট্যাঁক-ট্যাঁক করে বেজে উঠল কড়া। (বাংলা হরর গল্প)
দরজা খুলে দেখি ডাকপিয়ন, হাতে এক পুরনো, হলদেটে খাম। খামের গায়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা—
“রামপুর রায়বাড়িতে আসুন। আমাদের পরিবারের অতীত নিয়ে লিখতে হবে আপনাকে।”
— দেবাশিস রায়
খামের ভেতরে আরও আছে একটি সেকেন্ড-ক্লাস ট্রেনের টিকিট, কলকাতা থেকে রামপুর রেলস্টেশন—তারিখ ঠিক তিন দিন পরের। মজার ব্যাপার, খামটায় এক অদ্ভুত গন্ধ—পুরনো কাঠের স্যাঁতসেঁতে গন্ধে মিশে আছে পচা ফুলের মতো এক মিষ্টি, মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া গন্ধ।

এমন অদ্ভুত নিমন্ত্রণ নতুন নয় আমার জন্য। গ্রামীণ কিংবদন্তি, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, চৌরঙ্গির বইপাড়ায় পাওয়া অনামা ডায়েরি—এসব নিয়েই তো আমার লেখা। তবু এই খামটা হাতে নিয়ে বুকের কোথাও যেন হালকা কাঁপুনি ধরল। কফির কাপ নামিয়ে গুগলে সার্চ দিলাম—রামপুর রায়বাড়ি। ক’টা পুরনো খবর, দু’একটা ব্লগ—সব জায়গাতেই একই কথা: “১৮৯৭ সালে বাড়ির কর্তা জগদীশ রায় রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ। চাঁদের আলো পড়লেই রায়বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ শোনা যায়।” (বাংলা হরর গল্প)
মীর আফসার আলির সম্পূর্ণ জীবনী (বাংলায়) | Mir Afser Ali Biography in Bengali
কৌতূহল আর কাজের টান একসাথে টেনে নিল। ঠিক করলাম—যাওয়া হবেই।
যাত্রা : শহরের আওয়াজ পেরিয়ে নীরবতার দিকে
ট্রেন ধরলাম ভোরের দিকে। গাড়িটা ধীরে ধীরে শহরের কংক্রিট থেকে বেরিয়ে এল; জানলার বাইরে সবুজ মাঠ, সরু জঙ্গল, কাদা-মাখা পুকুর, শালুক-শাপলা। কামরায় খুব বেশি ভিড় নেই। পাশে বসা বৃদ্ধা শাড়ির আঁচল দিয়ে বারবার নাকে মুখে চাপা দিচ্ছেন—সম্ভবত সর্দি। প্ল্যাটফর্ম ছাড়ার সময় হকারের গলা—“চা-চা-চা!”—ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল।
ট্রেন যত ভেতরের দিকে ঢুকছে, মোবাইলের সিগন্যাল ততই টিমটিম করছে। একটা সময় দেখে মনে হল, সূর্যের আলোও যেন ধোঁয়াটে হয়ে এসেছে। আকাশ মেঘলা নয়, তবু রঙটা অদ্ভুত—মাটির ধুলো আর শীতের কুয়াশা মিলে যেন একটা পুরনো সেপিয়া-ফিল্টার। (বাংলা হরর গল্প)
রামপুর স্টেশনে নেমে দেখি প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা। দু’পাশে ঝোপঝাড়, টিনের চালা, আর দূরে দিগন্তে একটা কালীমন্দিরের গম্বুজ। স্টেশনের বাইরে চায়ের দোকান; কেটলির ঢাকনা কেঁপে কেঁপে উঠছে, ভেতর থেকে বাষ্পের সাথে যেন একটা নরম গন্ধ—লবঙ্গ, এলাচ, দুধ।
“সৌম্যবাবু?”
চমকে তাকালাম। বয়স পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশের এক লোক, ধুতি-পাঞ্জাবি, কাঁধে মাফলারের ফাঁসে চাবির গোছা ঝুলছে। গায়ে ধুলো-মাখা উলের সোয়েটার। লোকটা সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, “আমি শশী মাইতি। রায়বাড়ির পুরনো কর্মচারী। দেবাশিসবাবু পাঠিয়েছেন। চলুন, গাড়ি দাঁড় করানো আছে।”
হাসি দিয়ে বললাম, “চলুন।”
ঘোড়ার গাড়ি নয়—বাড়ির একটি পুরনো জীপ। স্টার্ট হতেই হড়বড় করে কাশি দিল। স্টেশন ছেড়ে খানিকটা যেতেই কাঁচা রাস্তা শুরু। দু’ধারে তাল-খেজুর, বট-পাকুড়। ঝোপের ফাঁকে ফাঁকে টিকটিকির মতো দৌরে যাচ্ছে ছায়া। দূরে বাঁক নিতেই দেখা গেল, নদী। নদীর ওপারে অস্পষ্ট কুয়াশার আঁচল; আর তার মাঝখানে ঝিকিমিকি করে উঠছে বিকেলের আলো।
“রায়বাড়ি খুব পুরনো?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম। (বাংলা হরর গল্প)
শশী রাস্তায় চোখ রেখে বলল, “প্রায় দুইশো বছরের। জগদীশ রায় ছিলেন বড় সাহেব। এক কালে সারা অঞ্চলের বিচার নিতেন। তারপর এক রাতে… উনি আর ফেরেননি।”
“খবরপত্র বলে, নিখোঁজ?”
“নিখোঁজ তো বটেই। তবে…” শশী গলার স্বর নামাল, “গ্রামে বলে, পূর্ণিমার রাতে প্রাসাদের করিডোরে টিপটিপ পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। আর কেউ কেউ শপথ করে বলেছে—কেউ যেন গাইছে, ধীরে ধীরে… পুরনো লালনগীতি।”
আমি পাশের জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম। মনে হল, একটা হিম বাতাস জীপের ভেতর ঢুকল। শীতটা কি একটু বেশি? নাকি গল্প শুনলেই এমন লাগে?
রায়বাড়ি : দরজার খিল, দেওয়ালের ফাটল, আর চোখের আড়াল
দশ মিনিট পরে জীপটা থামল। সামনে রামপুর রায়বাড়ি—উঁচু খিলান, মোটা স্তম্ভ, নীলচে-সাদা রঙ যেটা বহু আগেই খসে পড়ে ধূসর হয়ে গেছে। বাগানের গাছগুলো ছাঁটা নয়, জঙ্গলের মতো এলোমেলো। ড্রাইভওয়ে জুড়ে শুকনো পাতা, তারই ফাঁকে ফাঁকে ভাঙা ভাস্কর্য—দুটি সিংহ, একটার মুখের অর্ধেক নেই।
বারান্দার মাথায় ঝোলানো কাঁচের ঝাড়বাতি—মলিন, তবু আলো লাগলে হয়তো এখনও ঝিকিমিকি করবে। দরজায় আয়রন-রডের খিল; শশী চাবি ঘুরিয়ে খুলতেই চিঁইইঁক শব্দে মনে হল যেন বাড়িটা আত্মহারা হয়ে হাই তুলল। (বাংলা হরর গল্প)
ভেতরে পা দিতেই ঠান্ডার ছুরি পিঠ বেয়ে নামল। দেওয়ালে পুরনো তেলচিত্র—জগদীশ রায়ের পোর্ট্রেট; চোখদুটি অস্বাভাবিক বড়, যেন আঁকার সময় কেউ ইচ্ছে করে বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশের ফ্রেমে এক তরুণী—সম্ভবত পরিবারের কন্যা। ছবির তলায় মলিন অক্ষরে নাম: কুমারী হেমাঙ্গিনী।
“দেবাশিসবাবু আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন,” শশী বলল। “ডানদিকের করিডোর দিয়ে গেলে অতিথিশালার ড্রয়িংরুম।”
আমি ব্যাগ টেনে করিডোরে পা বাড়ালাম। করিডোরের মেঝেতে পুরনো মোজাইক; জায়গায় জায়গায় ফেটে উঠে আছে, যেন কেউ ভিতর থেকে ঠেলা দিয়েছে। ছাদের কাছ দিয়ে বাদুড় উড়ে গেল; তাদের পাখার শব্দ—ফটফটফট—খালি হলঘরে প্রতিধ্বনি হয়ে আবার ফিরে এল।
ড্রয়িংরুমে ঢুকে দেখি, জানালার পাশে এক মানুষ দাঁড়িয়ে। মাঝবয়সী, স্লিম, মুখে চীবুকজোড়া দাড়ি। চোখদুটোতে একধরনের ক্লান্তি।
“আপনি নিশ্চয়ই সৌম্যবাবু?” লোকটা এগিয়ে এসে হাত বাড়াল। “আমি দেবাশিস রায়। এতদূর থেকে এলেন, ধন্যবাদ।”
আমি হাসলাম। “আপনার চিঠিটা এতটা আলাদা না হলে হয়তো আসতাম না। তবে গল্পের শুরুটা তো জমজমাট। আশা করি, শেষটাও পাওয়া যাবে।”
দেবাশিস একমুহূর্ত চুপ করে থাকল। “শেষটা…” তারপর মাথা নাড়ল। “আপনি যা দেখবেন, লিখবেন। সত্যি যাই হোক, আমরা আর ঢাকব না।”
শশী চা নিয়ে এল। কাপ তুলতেই একটা সূক্ষ্ম গন্ধ পেলাম—লবঙ্গ-এলাচের মাঝেও কোথায় যেন সেই পচা ফুলের গন্ধ। আমি কাপ নামিয়ে দিলাম। (বাংলা হরর গল্প)
কথোপকথন : আয়নার ওপার
“আপনি নিশ্চয়ই পড়েছেন,” দেবাশিস শুরু করলেন, “১৮৯৭ সালে আমার প্রপিতামহ জগদীশ রায় এক রাতে নিখোঁজ হন। তার আগের বছরে এক ইংরেজ ভ্রমণকারী এসেছিলেন—নাম আর্চিবাল্ড স্লোন। তিনি নিজেকে ম্যাজিশিয়ান বলতেন। কথাই-কথায় প্রপিতামহের সঙ্গে খুব ভাব। তারপর থেকে এই বাড়িতে নাকি অদ্ভুত পরীক্ষা শুরু হয়েছিল—আয়না, ছায়া, আলো-অন্ধকার নিয়ে…”
নিশির ছায়া – শ্মশানপাড়ার রহস্যময় রাত | Horror Stories in Bengali | Bangla Bhuter Golpo
আমি আগ্রহে ঝুঁকে পড়লাম। “কী ধরনের পরীক্ষা?”
“কেউ জানে না। শুধু শুনেছি, লাইব্রেরির পিছনে একটা গোপন কক্ষ বানানো হয়েছিল। সেখানেই নাকি স্লোনবাবু—আয়নার মাধ্যমে ‘ওপারের দরজা’ খোলার চেষ্টা করতেন। পূর্ণিমার রাতে। শেষরাতে কেবল একটাই শব্দ শোনা গিয়েছিল—কারও গান। তারপর দরজা ভেঙে ঢুকলে কক্ষ ফাঁকা। প্রপিতামহ নেই। স্লোনও নেই। থেকে গেছে শুধু—একটা বড় আয়না।”
আমি নোটবুকে টুকে রাখলাম। “আর হেমাঙ্গিনী? ছবিতে যে তরুণী?”
দেবাশিস চমকে তাকালেন। “আপনি ছবিটা দেখেছেন? উনি আমাদের পরিবারের ভীষণ অমঙ্গল। প্রপিতামহের বোন। তাঁর বাগদান ভেঙে যায়। তারপর…”
তিনি থামলেন। জানালার বাইরে বাতাসের হালকা ঝাপটা। পর্দা কাঁপল।
“তারপর?”
“এক রাতে তিনি ছাদ থেকে পড়ে মারা যান। কেউ বলে—দুর্ঘটনা। কেউ বলে—নিজে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। আর কেউ কেউ বলে—কেউ তাঁকে ডেকেছিল।”
রুমটার তাপমাত্রা যেন হঠাৎ আরও নেমে গেল। আমি গলার কফ পরিষ্কার করলাম। “আমি আজই লাইব্রেরিটা দেখতে চাই। আপনার আপত্তি?”
“আপত্তি নেই।” দেবাশিস উঠে দাঁড়ালেন। “তবে একটা কথা—রাতে ওই দিকটায় না যাওয়াই ভালো। বিশেষ করে, যদি আজ চাঁদের আলো পড়ে।” (বাংলা হরর গল্প)
অতিথিশালা: দেওয়ালের কান্না ও দরজার ও-পারে
শশী আমাকে যে ঘরটা দেখিয়ে দিল, সেটি অতিথিশালার দক্ষিণ কোণে। বড় খাট, পুরনো আলমারি, দেওয়ালে মলিন রঙের ফুলেল ওয়ালপেপার। জানালার ধারে টেবিল, তার ওপরে কয়েকটা বই—রামপুরের লোকগাথা, বঙ্গদেশের হারানো প্রাসাদ, আর একখানা পাতলা কাগজে বাঁধা ডায়েরি।
ডায়েরিটা খুলতেই কুঁচকে গেল নাক—সেই চেনা গন্ধ। প্রথম পাতায় কাঁপা হাতে লেখা—
“যদি তুই এই লাইন পড়িস, তবে জানিস—আমি ফিরে আসব। চাঁদের আলোয়… কালরাত্রিতে।”
শব্দগুলো লালচে কালি দিয়ে লেখা, কোথাও কোথাও কালি ছড়িয়ে গেছে, যেন ভেজা আঙুল টেনে নিয়ে গেছে অক্ষরের গলা।
আমি ডায়েরি বন্ধ করে টেবিলে রাখলাম। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি, আকাশে আজ সত্যিই একটা সাদা, গোল চাঁদ উঠছে—কুয়াশার পাতলা আবরণে ঢাকা।
শশী রাতে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে গেল। দরজা ভেজাতে-ভেজাতে বলল, “সৌম্যবাবু, শুয়ে পড়বেন তাড়াতাড়ি। বাতাস আজ একটু বেশি। আর… যদি টিপটিপ শব্দ শোনেন, দরজা খুলবেন না। গ্রামে বলে, তা হলে ওরা ভিতরে ঢুকে পড়ে।”
আমি হেসে উড়িয়ে দিলাম, “ওরা কারা?”
শশী চোখ নিচু করল। “যাদের জন্য আমরা রাত হলে পর্দা টেনে দিই।” বলেই চলে গেল। (বাংলা হরর গল্প)
রাত নামলে : শব্দ, ছায়া, আর চারপাশে জমে ওঠা ঠান্ডা
ঘড়িতে তখন সাড়ে দশটা। বাতি নিভিয়ে খাটে শুয়ে পড়েছি। বাইরে বাতাসের শব্দ—হুঁঁউঁউঁ—বারান্দার লোহার রেলিংয়ে ঠেকে কাঁপছে। মাঝে-মাঝে মনে হচ্ছিল, দূরে কোথাও একটা আলগা দরজা ঠক-ঠক করে লাগছে।
ঠিক সেই সময়—খুব হালকা, প্রায় শোনা যায় না—কেউ যেন করিডোরে হাঁটছে। টিপ… টিপ… টিপ…। আমি নিঃশ্বাস আটকে শুনতে লাগলাম। শব্দটা ঠিক আমার দরজার সামনে এসে থামল।
নীরবতা।
তারপর—একটি গলায় ভেসে এল—খুব নিচু, খুব ধীর—একটি পুরনো লালনের সুর। কথা স্পষ্ট নয়, কিন্তু সুরের সঙ্গে ছিল কান্নার হালকা কম্পন।
আমি উঠে বসেছি। দরজার দিকে তাকিয়ে আছি। খিলটা ভেতর থেকে লাগানো। তবু দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে একটা চিকচিকে রেখা টেনে দিল মেঝেতে।
আর সেই আলোয়…
আমি দেখলাম ভেজা পায়ের ছাপ—দরজার বাইরের দিক থেকে ভিতরে ঢুকছে না, বরং ভিতর থেকে বাইরে যাচ্ছে। যেন কেউ এই ঘর থেকেই বেরিয়ে গেছে—যখন দরজার খিল ভিতর থেকে আটকানো!
আমি গা-টা কাঁপতে দেখলাম নিজের। দরজার কাছে যেতেই হালকা ঠান্ডা কুয়াশার মতো কিছু মুখে এসে লাগল। আমি আবার খাটে ফিরে এলাম। মাথার মধ্যে কেবল ঘুরছে—ভিতর থেকে বাইরে… ভিতর থেকে বাইরে…।
ঘড়িতে এগারোটা। গানের সুরটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। করিডোর আবার নিস্তব্ধ। কিন্তু মেঝের উপর ভেজা পায়ের ছাপ রয়ে গেল—ধীরে ধীরে শুকোতে থাকা জলরঙের মতো। (বাংলা হরর গল্প)
আমি ডায়েরিটা আবার খুললাম। দ্বিতীয় পাতায় একটাই লাইন—
“আয়না খুললে তুই দেখবি—হাসছে যে, সে তুই নও।”
শরীরের সমস্ত রোমখাঁড়া খাড়া হয়ে উঠল। জানালার কাচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতে সাহস পেলাম না আর। বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। অন্ধকারে কোথাও যেন কড়িকাঠে টিপ… টিপ… করে জল পড়ছে।
চোখ বন্ধ হওয়ার ঠিক আগে, মনে হল কেউ আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—
“চাঁদের আলো পড়লেই দরজা খুলে দিও… আমি ফিরে আসব।”
আমি চোখ খুললাম ঝটকা খেয়ে। ঘড়িতে বারোটা পেরিয়ে গেছে। ঘরের ভেতর কেউ নেই। কিন্তু জানালার পর্দা কেন যেন নিজে থেকেই ধীরে ধীরে দুলছে। বাতাস বন্ধ। তবু দুলছে।
অধ্যায় ২ – লাইব্রেরির আড়ালে গোপন কক্ষ
ট্রেন থেকে নেমে রামপুর স্টেশনে পা রাখতেই মনে হলো সময় যেন পেছনে ফিরে গেছে। ধূসর প্ল্যাটফর্ম, একফালি চা দোকান, আর দূরে ম্লান আলোতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে এলেন প্রায় পঞ্চাশোর্ধ এক ব্যক্তি—নিজেকে পরিচয় দিলেন দেবাশিস রায়।
রায়বাড়িতে পৌঁছানোর পথটা যেন অন্য এক জগতে নিয়ে যাচ্ছিল। কুয়াশায় ঢাকা সরু পথ, দু’পাশে বিশাল অশ্বথ ও বটগাছ, আর কোথাও কোথাও শোনা যাচ্ছে নিশুতি রাতে শেয়ালের ডাক।
প্রাসাদে ঢোকার পর প্রথমেই চোখে পড়ল বিশাল কাঠের দরজা, যেটিতে প্রাচীন খোদাই করা নকশা। ভেতরে পা রাখতেই ধুলো ও পুরনো কাগজের গন্ধে নাক ভরে গেল। দেবাশিসবাবু আমাকে নিয়ে গেলেন বাড়ির লাইব্রেরিতে—চারদিক জুড়ে উঁচু তাক, পুরনো বই আর জালের আস্তরণ।
(বাংলা হরর গল্প)
হঠাৎ নজরে এল এক কোণে রাখা কাঠের আলমারি। তার পিছনের দেয়ালে অদ্ভুত ফাঁকা জায়গা। আমি কাছে গিয়ে হাত বোলাতেই ‘ঠক’ শব্দে বুঝলাম—এটা ফাঁপা। দেবাশিসবাবু একটু থেমে বললেন, “এই দেয়ালের আড়ালেই আছে আমাদের পরিবারের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর গোপন কক্ষ… যেটা খুলে কেউ বাঁচে না।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম। তিনি নীরবে জানালেন, সেই কক্ষ নাকি এক শতাব্দী ধরে বন্ধ। শেষবার যখন খোলা হয়েছিল, তখন এক বৃদ্ধ চাকর অদ্ভুতভাবে মারা যান—তার মুখ বিকৃত হয়ে যায়, চোখ ফেটে যায়, আর দেহ থেকে বের হয়েছিল গা ছমছমে ঠান্ডা হাওয়া।
আমার মনে কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। আমি বুঝতে পারছিলাম, রায়বাড়ির রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি হয়তো এই গোপন কক্ষেই লুকিয়ে আছে।
অধ্যায় ৩ – পূর্ণিমার রাতের অদ্ভুত শব্দ
সেদিন সন্ধ্যায় আকাশে হালকা মেঘ জমলেও চাঁদের আলো ছিল স্পষ্ট। দেবাশিসবাবু আমাকে সতর্ক করে দিলেন, “আজ রাতটা প্রাসাদে একা বের হবেন না। পূর্ণিমার রাতে এখানে… কিছু ঘটে।”
রাত গভীর হতেই, জানালার বাইরে থেকে ভেসে এল এক অদ্ভুত শব্দ—যেন কেউ কাঠের মেঝেতে ধীরে ধীরে হাঁটছে। প্রথমে ভেবেছিলাম বাতাসে দরজার কপাট নড়ছে, কিন্তু পরের মুহূর্তেই স্পষ্ট পায়ের শব্দ, সঙ্গে হালকা ফিসফাস কানে এল।
আমি দরজা খুলে করিডোরে বেরোলাম। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো দাদুর ঘড়ির ‘টিক-টক’ শব্দ শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ, লাইব্রেরির দিক থেকে এক চাপা গর্জন শোনা গেল, তারপরই বইয়ের তাকের পেছন থেকে আসল ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা।
(বাংলা হরর গল্প)
আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে এল। মনে হলো যেন কেউ বা কিছু সেই গোপন কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে…
অধ্যায় ৪ – অশুভ দরজা
পরদিন সকালে দেবাশিসবাবুর সঙ্গে আবার লাইব্রেরিতে গেলাম। গত রাতের ঘটনাটা আমি তাকে বলতে গিয়েও থেমে গেলাম—তার মুখে এক অদ্ভুত আতঙ্কের ছাপ।
তিনি বললেন, “তুমি যা শুনেছ, সেটা বাস্তব… এই দরজার ওপাশে আছে এক অভিশাপ। আমার ঠাকুরদা এক ব্রাহ্মণ তান্ত্রিককে হত্যা করেছিলেন। সেই তান্ত্রিক মৃত্যুর আগে শপথ নিয়ে বলেছিলেন—‘তোমাদের পরিবার কখনও শান্তি পাবে না।’ তখন থেকেই এই কক্ষ অভিশপ্ত।”
আমি হাত বাড়িয়ে আলমারিটা সরাতে লাগলাম। দেবাশিসবাবু প্রথমে বাধা দিলেও, আমার কৌতূহল থামানো গেল না। কাঠের প্যানেল সরাতেই দেখা গেল লোহার মোটা দরজা, যার গায়ে খোদাই করা আছে কিছু অদ্ভুত চিহ্ন।
দরজা খুলতেই এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া এসে গায়ে লাগল। ভেতরে অন্ধকার, কিন্তু দূরে একটা ক্ষীণ লাল আলো জ্বলছে। আমরা টর্চ জ্বালিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। (বাংলা হরর গল্প)
অধ্যায় ৫ – মৃত্যুর ছায়া
কক্ষের মেঝেতে পুরনো পিতলের হাঁড়ি, কিছু পোড়া কাগজ আর মাঝখানে অর্ধেক পচা কাঠের কফিন। কফিনের ঢাকনায় আঁকাবাঁকা হাতে লেখা কিছু মন্ত্র।
হঠাৎ, বাতি নিভে গেল। কক্ষ কাঁপতে শুরু করল, আর অদৃশ্য কারও ফিসফিস কানে ভেসে এল—“তুমি এখানে কেন?”
দেবাশিসবাবুর গলায় আতঙ্কের সুর—“এটা ছেড়ে বেরিয়ে চল!” কিন্তু দরজাটা যেন বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। আমি অনুভব করলাম ঠান্ডা, শীতল আঙুল আমার কাঁধ স্পর্শ করল। ঘুরে দেখি—এক শূন্য কালো মুখ, যার চোখ থেকে বেরোচ্ছে ধোঁয়া।
আমরা প্রাণপণে ধাক্কা দিতে লাগলাম, অবশেষে দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। দেবাশিসবাবুর মুখ বিবর্ণ, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। (বাংলা হরর গল্প)
অধ্যায় ৬ – সমাপ্তি নাকি শুরু?
প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা রাখতেই ভোরের আলো ফুটে উঠছিল। দেবাশিসবাবু বললেন, “এবার তুমি চলে যাও। এই প্রাসাদ তোমার জন্য নয়।”
ট্রেনের কামরায় বসে দূরে প্রাসাদটাকে দেখতে পেলাম—মেঘের আড়ালে অর্ধেক ঢাকা, যেন চুপচাপ তাকিয়ে আছে। আমার মনে হচ্ছিল, আমি কিছু নিয়ে এসেছি… কক্ষের ভিতরের সেই ফিসফিসানি যেন এখনও কানে বাজছে।
গল্প শেষ হলেও, রহস্য রয়ে গেল। হয়তো একদিন আমি আবার ফিরে আসব… কিন্তু পরের বার, হয়তো কালরাত্রি আমাকে ছাড়বে না। (বাংলা হরর গল্প)

1 thought on “কালরাত্রির প্রাসাদ – বাংলা মিস্ট্রি হরর গল্প | Horror Mystery Stories in Bengali”