ডিসেম্বরের শীতে, কাশিপুরের নদীর ধারে যখন কুয়াশা সবকিছু ঢেকে ফেলে, তখনও কি আপনি বাইরে বেরোবেন?
কারণ এই কুয়াশার ভেতর আছে এক ভয়ঙ্কর ডাক… যার উত্তর দিলে হয়তো আর ফেরা সম্ভব নয়।
অধ্যায় ১: কুয়াশার রাত | Bangla Bhuter Golpo
সেদিন ডিসেম্বরের শেষ রাত। নদীর ধারে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। গ্রামের নাম – কাশিপুর। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার একেবারে শেষ প্রান্তে, যেখানে শীতের কুয়াশা এত ঘন হয় যে ভোরের আগে হাত বাড়ালেও নিজের আঙুল দেখা যায় না।
আমার নাম অনিরুদ্ধ। কলকাতায় থাকি, কিন্তু শীতকালে প্রায়ই গ্রামে চলে আসি। গ্রামের এই শীতের রাতের এক আলাদা মায়া আছে – কুয়াশা, ঠান্ডা হাওয়া, আর দূরের বাঁশবনে হুহু করে বইতে থাকা হাওয়ার শব্দ। কিন্তু সেই রাতে, সেই মায়া যেন অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে পরিণত হয়েছিল।
কারণ, আগের দিন সন্ধেবেলায় কাকার কাছ থেকে একটা পুরোনো গল্প শুনেছিলাম।
তিনি বললেন –
“এই গ্রামে এক সময় নীলা নামের এক মেয়ে ছিল। বয়স ছিল কেবল সতেরো। হঠাৎ একদিন শীতে কুয়াশার ভেতরে হারিয়ে যায়। তিন দিন পর তার মৃতদেহ মেলে নদীর ধারে। কিন্তু গ্রামের লোকেরা বলে – নীলা আসলে মারা যায়নি… তাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল নিশি। আর আজও, এই ডিসেম্বরের কুয়াশার রাতে, সে ডাক দেয়… যার কানে পৌঁছয়, সে আর ফেরে না।”
আমি এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু কাকার চোখের ভেতরে তখন এমন এক ভয় ছিল, যা আমার বুকের ভেতরে ঠান্ডা স্রোতের মতো নেমে এল।
রাত তখন সাড়ে দশটা। আমি খড়ের বিছানায় শুয়ে আছি, বাইরে বাঁশপাতার মৃদু শব্দ, মাঝে মাঝে দূরের শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। ঠিক তখনই, কানে ভেসে এল এক অদ্ভুত শব্দ –
“অনিরুদ্ধ… অনি… অনি…”
আমার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। কণ্ঠস্বরটা ছিল একদম মেয়েলি, নরম, কিন্তু ঠান্ডা। মনে হল যেন খুব কাছে থেকেও ডাকছে, অথচ বাইরে কুয়াশা ছাড়া কিছুই নেই।
আমি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। কুয়াশার মধ্যে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু সেই ডাক এবার আরও স্পষ্ট –
“অনি… এসো… নদীর ধারে…”
আমার গলা শুকিয়ে গেল। পা যেন নিজে থেকেই এগিয়ে যেতে চাইছে, অথচ মাথার ভেতরে কাকা’র কথা বাজছে – “যার কানে নিশির ডাক পৌঁছয়, সে আর ফেরে না।”
অধ্যায় ২: নদীর ধারের ছায়া | Bangla Bhuter Golpo
বাইরে তখন ঘন কুয়াশা। দূরের কোনো আলোও যেন সেই সাদা পর্দার আড়ালে আটকে গেছে।
আমি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছি, বুকের ভেতর ধপধপ শব্দ যেন পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে।
সেই কণ্ঠস্বর আবারও ভেসে এল –
“অনি… এসো… নদীর ধারে…”
শব্দের ভেতরে এক অদ্ভুত টান।
যেন না গেলে কিছু একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হারাবো…
আবার মনে হচ্ছে, যদি যাই তবে আর ফেরার পথ নেই।
আমি চোখ বন্ধ করলাম। এটা কেবল আমার মনের ভুল… হয়তো বাতাসের শব্দকেই আমি ভুল শুনছি।
কিন্তু তখনই – বাঁশবনের দিক থেকে আসা ঠান্ডা হাওয়ার সঙ্গে এক হালকা সুগন্ধ নাকে এল।
গন্ধটা ঠিক যেমন হয় কচি গাছের পাতা আর শিউলি ফুলের মিশ্রণে…
অথচ শীতের এই সময় শিউলি ফুল ফোটে না।
আমার কানে তখন কাকার কথা বাজছে –
“নীলার চুলে নাকি সবসময় শিউলির গন্ধ থাকত…”
আমি জানালাটা বন্ধ করে শুয়ে পড়তে চাইলাম। কিন্তু ঘরের ভেতর তখনও সেই গন্ধ, সেই কণ্ঠস্বর যেন দেয়ালে, ছাদে, মেঝেতে লেগে আছে।
ঘড়িতে সময় রাত ১০টা ৪৫।
শেষমেশ একটা মোটা কম্বল জড়িয়ে চোখ বন্ধ করলাম।
কিন্তু ঘুম এল না।
বরং অনুভব করলাম, কম্বলের নিচেও যেন কেউ আমার মাথার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
চোখ খুলে তাকালাম –
কিছুই নেই… কিন্তু জানালার কাঁচে কুয়াশার ভেতর থেকে এক জোড়া অস্পষ্ট চোখ তাকিয়ে আছে।
আমি হকচকিয়ে উঠে গেলাম। দরজা খুলে বাইরে বের হলাম –
চারপাশে শুধু কুয়াশা আর নীরবতা।
তবু আমার মনে হচ্ছিল কেউ আমার থেকে মাত্র কয়েক কদম দূরে হাঁটছে…
শব্দ নেই, কেবল পায়ের নিচে মাটির হালকা চাপা আওয়াজ।
গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম নদীর ধারে।
কুয়াশার মধ্যে নদীটাকে মনে হচ্ছিল কোনো কালো রঙের স্থির জলরাশি – কোনো ঢেউ নেই, কোনো শব্দ নেই।
ঠিক তখনই…
কুয়াশার ভেতর থেকে একটা অবয়ব ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে লাগল।
মেয়েটা সাদা শাড়ি পরে, মাথায় খোঁপা, চুলের ফাঁক থেকে শিউলির ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে।
মুখটা ফ্যাকাশে, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি, আর চোখে এমন এক শূন্যতা – যেন সে আমার দিকে তাকিয়ে নেই, তাকিয়ে আছে আমার ভেতরের কোথাও।
সে মৃদু স্বরে বলল –
“অনি… তুমি এসেছ… আমি জানতাম তুমি আসবে…”
আমার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, তবু জিজ্ঞাসা করলাম –
“কে… তুমি?”
সে হাসল।
“তুমি আমাকে চেনো… নীলা।”
আমার মাথার ভেতর তখন যেন শিসের মতো বাতাস বয়ে যাচ্ছে।
এটাই কি সেই নীলা, যাকে গ্রাম হারিয়ে ফেলেছিল বহু বছর আগে?
আমি কিছু বলার আগেই সে হাত বাড়িয়ে দিল।
তার হাতের আঙুলগুলো ছিল বরফের মতো ঠান্ডা।
ঠিক তখনই, দূরে কোথাও একটা কাক হঠাৎ কর্কশভাবে ডাকল… আর আমার গা কাঁপিয়ে দিল।
নিশির ছায়া – শ্মশানপাড়ার রহস্যময় রাত | Horror Stories in Bengali | Bangla Bhuter Golpo
অধ্যায় ৩: বরফ-ঠান্ডা স্পর্শ | Bangla Bhuter Golpo
নীলার হাতের ঠান্ডা যেন আমার শরীরের প্রতিটা রক্তনালী দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল।
শীতের রাতেও এমন হিমশীতল স্পর্শ… যেন জীবনের উষ্ণতা নেই।
আমি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমার আঙুলগুলো যেন অবশ হয়ে গেছে।
নীলা আমার চোখের দিকে তাকাল।
তার চোখদুটি গভীর কালো, তবু কোথাও যেন একটা অস্পষ্ট আলো জ্বলছে—মনে হচ্ছিল, সেই চোখের ভেতর ডুবে গেলে আমি আর ফেরার রাস্তা খুঁজে পাব না।
সে ফিসফিস করে বলল—
“তুমি কি জানো… তোমারও আমার মতো একদিন… চলে যেতে হবে।”
আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করলাম—
“কোথায়…?”
নীলার ঠোঁটে আবার সেই অদ্ভুত হাসি ফুটল।
“যেখান থেকে কেউ ফেরে না…”
আমার মনের ভেতরে তখন আতঙ্কের ঢেউ উঠছে, তবু পা যেন তার দিকে এগিয়ে চলেছে।
পেছন থেকে নদীর জলরাশির দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম—নদীর কালো জলে অসংখ্য শিউলিফুল ভাসছে, আর প্রতিটা ফুল থেকে যেন ঠান্ডা কুয়াশার ধোঁয়া বের হচ্ছে।
হঠাৎ, দূরে বাঁশবনের দিক থেকে মাটির ওপর কারও দৌড়ানোর শব্দ এল।
শব্দটা খুব দ্রুত এগিয়ে আসছে।
নীলা হঠাৎ থেমে গেল, তার চোখে এক ঝলক রাগ ফুটে উঠল।
সে আমার হাত ছেড়ে নদীর দিকে এগোল।
পরের মুহূর্তেই কাকা আমার কাঁধ ধরে টেনে নিয়ে গেলেন।
তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন—
“বোকা! তুই কি মরতে চাইছিস? চোখে চোখ রাখিস না, না হলে তোর প্রাণ বাঁচবে না!”
আমি তাকিয়ে দেখলাম—নীলা তখন নদীর ধারে দাঁড়িয়ে, তার চুল বাতাসে উড়ছে, আর মুখে এক শূন্য হাসি।
আমাদের দিকে তাকিয়ে সে বলল—
“তুমি তো এসে গিয়েছিলে… কেন চলে যাচ্ছ?”
কাকা কোনো উত্তর দিলেন না, শুধু আমাকে টেনে নিয়ে মাটির পথে হাঁটতে লাগলেন।
আমরা যত দূরে যাচ্ছিলাম, নীলার ডাক তত ফিকে হয়ে যাচ্ছিল—
“অনি… এসো… এসো…”
গ্রামের চৌকাঠ পার হতেই কাকা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“ওটা মানুষ না। ও নিশি। তোর নাম ধরে ডাকতে পারত না যদি আগে থেকে তোর পরিচয় না জানত… তুই নিশ্চয়ই আমার কথা শোনার পর মনে মনে অনেক ভেবেছিস… তাই ও তোর কাছে পৌঁছে গেছে।”
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু হঠাৎ লক্ষ্য করলাম—আমার ডান হাতের কব্জিতে হালকা নীলচে দাগ।
দেখে মনে হচ্ছিল, কেউ বরফের টুকরো দিয়ে চেপে ধরেছে অনেকক্ষণ।
কাকা গম্ভীর মুখে বললেন—
“দাগটা যেদিন মিলিয়ে যাবে… সেদিন থেকে সাবধানে থাকিস। কারণ তখন আবার নিশির ডাক আসবে।”
আমার বুকের ভেতর ঠকঠক শব্দ শুরু হল।
কীভাবে এই ডাক থেকে নিজেকে বাঁচাব, আমার কোনো ধারণা নেই…
অধ্যায় ৪: নিষিদ্ধ কুয়াশা | Bangla Bhuter Golpo
সেদিনের রাতটা আর ঘুমিয়ে উঠতে পারিনি।
কাকার ঘরের দরজা ভেজানো ছিল, তবু ভেতর থেকে মৃদু মন্ত্রপাঠের শব্দ ভেসে আসছিল।
বুঝতে পারছিলাম, উনি সারা রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন।
আমার হাতের নীলচে দাগটা বরফের মতো ঠান্ডা।
আশ্চর্যের বিষয়—শীতের মধ্যে থেকেও দাগের জায়গায় যেন কোনো রক্তপ্রবাহ নেই, স্পর্শ করলেই মনে হচ্ছে, ওই অংশটা আমার শরীরেরই নয়।
ভোরের দিকে একটু চোখ লেগেছিল, কিন্তু হঠাৎ কানে এল ফিসফিসানি—
“তুমি তো আসবে বলেছিলে…”
আমি হঠাৎ উঠে বসে চারপাশে তাকালাম—ঘরে কেউ নেই, জানালার ফাঁক দিয়ে কুয়াশা ঢুকে পড়েছে।
কুয়াশার ভেতরে অস্পষ্টভাবে একটা নারীমুখ ভেসে উঠল, কিন্তু আমি পলক ফেলতেই মিলিয়ে গেল।
সকাল হতে কাকা আমাকে ডেকে বললেন—
“আজ বিকেলের আগেই তুই কলকাতায় ফিরে যা।”
আমি অবাক হয়ে বললাম—
“কিন্তু কাকা, ব্যাপারটা কী? নীলা আসলে কে ছিল?”
কাকা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গভীর গলায় বললেন—
“সব কথা সবাই জানে না, কিন্তু আমি জানি। তুই শুনে ভয় পেতে পারিস।”
তারপর উনি ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন—
পঁচিশ বছর আগে নীলা ছিল গ্রামেরই এক পরিবারের মেয়ে। সুন্দরী, হাসিখুশি, কিন্তু খুব গরিব ঘরে জন্ম।
গ্রামের প্রভাবশালী জমিদারের ছেলে রুদ্রর সঙ্গে তার গোপনে প্রেম হয়।
কথা ছিল, একদিন রুদ্র তাকে বিয়ে করবে।
কিন্তু শীতে, পৌষের এক কুয়াশাঘেরা রাতে, রুদ্র নীলাকে নদীর ধারে ডেকে পাঠায়।
সেই ডাকে সাড়া দিয়ে নীলা যায়—আর ফেরে না।
পরদিন সকালে তার দেহ নদীতে ভেসে ওঠে, গলায় দাগ, চুলে শিউলিফুল।
গ্রাম তখন বলেছিল—ওটা আত্মহত্যা।
কিন্তু কাকা বললেন—
“আমি জানি, এটা ছিল না কোনো আত্মহত্যা। নীলাকে হত্যা করে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। আর যেদিন ও মারা যায়, সেই দিন থেকেই ওর আত্মা নিশি হয়ে ফিরে আসে। প্রথমে ডাকে রুদ্রকে, কিন্তু রুদ্র গ্রাম ছেড়ে পালায়। তারপর থেকে ও যে কাউকে টেনে নেয়, যার মধ্যে একাকিত্ব, ভয়, বা অজানা টান থাকে।”
আমি হেসে বলার চেষ্টা করলাম—
“তাহলে কি আমার মধ্যে সেই টান আছে?”
কাকা গম্ভীর মুখে বললেন—
“তুই শহরে থাকিস, তোর জীবনে হয়তো অনেক কিছু চাপা আছে… আর নিশি সেই দুর্বল জায়গা খুঁজে পায়। তোর নাম ধরে ডাকাটা হালকা ব্যাপার না।”
তারপর কাকা নিচু গলায় যোগ করলেন—
“আজ রাতে যদি তুই থেকে যাস, আমি তোকে বাঁচাতে পারব না।”
আমি তখন দ্বিধায় পড়ে গেলাম—একদিকে ভয়, অন্যদিকে কৌতূহল।
নদীর ধারে যে চোখদুটি দেখেছি, যে ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়েছি—ওটার আসল রহস্য না জেনে চলে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
কিন্তু আমি জানতাম না… ওই সিদ্ধান্তই আমাকে এমন এক পথে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে ফেরা প্রায় অসম্ভব।
অধ্যায় ৫: কুয়াশার ফাঁদ | Bangla Bhuter Golpo
সন্ধ্যা নামতেই কাশিপুরে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এল।
গ্রামের কুকুরগুলো অকারণে হাউ হাউ করে ডাকছে, বাঁশবনে পেঁচার কর্কশ ডাক—সব মিলিয়ে পরিবেশটা যেন ভয়ের এক অদৃশ্য পর্দায় ঢেকে গেল।
কাকার নিষেধ সত্ত্বেও আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—আজ রাতে কোথাও যাব না, কিন্তু যা-ই ঘটুক, মুখোমুখি হবো।
ঘরের আলো নিভিয়ে, কেবল কেরোসিনের লণ্ঠন জ্বালিয়ে আমি জানালার ধারে বসে রইলাম।
রাত সাড়ে দশটা।
প্রথমে কিছুই হল না।
তারপর…
একটা খুব মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট সুরভি নাকে এল—শিউলিফুলের গন্ধ।
একইসঙ্গে বাইরে থেকে ভেসে এল সেই পরিচিত ডাক—
“অনি… অনি… তুমি এসো…”
আমার গা শিউরে উঠল।
ডাকটা আগের চেয়ে অনেক কাছে, অনেক মিষ্টি, কিন্তু একইসঙ্গে ভীষণ ঠান্ডা।
আমি জানালার বাইরে তাকালাম—
কুয়াশার ভেতর ধীরে ধীরে একটা অবয়ব গড়ে উঠছে।
সাদা শাড়ি, খোলা চুল, কপালে চাঁদের মতো ফ্যাকাশে আলো।
নীলা।
সে এবার জানালার খুব কাছে এসে দাঁড়াল।
চোখদুটি একদম আমার চোখে আটকে দিল—
“তুমি তো বলেছিলে, আমার কথা শুনবে… আজ এসো… শুধু একটু নদীর ধারে…”
আমি বুঝতে পারলাম, আমার শরীরের ভেতরে একটা অদৃশ্য শক্তি আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
হাত, পা অবশ, মাথা ভারী—আমি যেন নিজের ইচ্ছায় নয়, তার ইচ্ছায় উঠছি, দরজা খুলছি।
ঠিক তখনই, কাকা ঘরে ঢুকে চেঁচিয়ে উঠলেন—
“চোখ নামা! ওর দিকে তাকাস না!”
তিনি হাতে ধূপকাঠি আর একগাদা তুলসীপাতা নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন।
কাকা কিছু মন্ত্রপাঠ শুরু করতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল।
তারপর এক তীব্র, কর্কশ চিৎকার—যেন নারীর গলায় কিন্তু মানুষের নয়—কানে বিঁধে গেল।
কুয়াশার ভেতর নীলা মিলিয়ে গেল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর রয়ে গেল—
“তুমি আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না, অনি… কাল রাতে আমি আসব… তোমাকে নিয়েই ফিরব।”
কাকা আমার হাত ধরে বললেন—
“দেখলি? আজ যদি আমি সময়মতো না আসতাম, তুই শেষ হয়ে যেতি। কিন্তু কালকের রাত আরও ভয়ঙ্কর হবে। যদি ফিরতে চাস, কাল ভোরের আগে গ্রাম ছাড়বি।”
আমার মনে হচ্ছিল, এই রাত কাটলেই সব শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে… আমার ভেতরে একটা অজানা আকর্ষণ কাজ করছিল—আমি নীলার মুখটা আবার দেখতে চাইছিলাম।
আমি বুঝতে পারছিলাম না—এটা কেবল কৌতূহল, নাকি নিশির ডাকার শুরু।

3 thoughts on “নিশির ডাক – রাতে ঘটে যাওয়া ভৌতিক সত্য ঘটনা | Horror Stories in Bengali | Bangla Bhuter Golpo”